• শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৫০ অপরাহ্ন
  • |
  • |
সংবাদ শিরোনাম :
শ্রীমঙ্গল কমলগঞ্জ সড়কে বাইক দুর্ঘটনায় যুবকের মৃত্যু মদ পান করে দুই নারীকে ইভটিজিং, পুলিশকে বাধা,আটক যুবক শ্রীমঙ্গলে সাসাকাওয়া হেলথ ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিদল শ্রীমঙ্গলে কিশোরীকে অপহরণের পর গণধর্ষণের অভিযোগ, গ্রেপ্তার ৩ বিশ্ব পর্যটন দিবস উপলক্ষে ট্যুরিজম কমলগঞ্জের আয়োজনে মনিপুরী নৃত্যশিল্পীদের মনোমুগ্ধকর নৃত্য পরিবেশন কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গলে নানা আয়োজনে বিশ্ব পর্যটন দিবস উদযাপন শ্রীমঙ্গলে বাস-সিএনজি মুখোমুখি সংঘর্ষে নিহত ৩ শ্রীমঙ্গলে ম্যানেজার বাংলো থেকে ৮ ফুটের অজগর উদ্ধার কমলগঞ্জ লাউয়াছড়ার বাঘমারা ক্যাম্পে পরিত্যক্ত জায়গায় পরিবেশবান্ধব গাছের চারা রোপণ। কমলগঞ্জে ধলাই নদীতে নিখোঁজ টমটম চালকের মরদেহ ২৫ ঘণ্টা পর উদ্ধার

৮ বছর ধরে চাঁদা দেওয়ার পর এক কিস্তি বন্ধ, ফল ধরার আগমুহূর্তে ১,২০০ কমলা গাছ কাটার অভিযোগ বন বিভাগের বিরুদ্ধে

রিপোটার : / ৬৬৩ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : রবিবার, ১৯ জুলাই, ২০২৬

মোঃ আহাদ মিয়া, মৌলভীবাজার শ্রীমঙ্গল কমলগঞ্জ প্রতিনিধি :
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার রাজকান্দি বন রেঞ্জের আদমপুর বন বিটের কালিঞ্জি এলাকায় বন বিভাগের উচ্ছেদ অভিযানে একটি পরিবারের প্রায় ১,২০০ ফলন্ত কমলা গাছ কেটে ফেলার অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, গত আট বছর ধরে বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তাকে নিয়মিত মাসোহারা (চাঁদা) দেওয়ার পরও এবার আর্থিক সংকটের কারণে টাকা দিতে না পারায় প্রতিশোধমূলকভাবে তাদের সাজানো বাগান ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে।
‘৮ বছর চাঁদা নিল, ফল ধরার সময় গাছ কাটল কেন?’ স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি বাগানটি অবৈধই হয়ে থাকে, তাহলে রোপণের সময় বা এক-দুই বছরের মধ্যেই ব্যবস্থা নেওয়া হলো না কেন? আট বছর ধরে গাছ বড় হতে দেওয়া হলো, আর ফল ধরার সময়ই কেন উচ্ছেদ অভিযান চালানো হলো?
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, শুরু থেকেই তারা বন বিভাগের বন বিট  কর্মকর্তাকে নিয়মিত টাকা দিয়ে আসছিলেন। কিন্তু এবার পারিবারিক আর্থিক সংকটের কারণে সেই টাকা দিতে না পারায় তাদের পুরো বাগান কেটে ফেলা হয়েছে।
ঋণের টাকায় গড়া স্বপ্ন মুহূর্তেই শেষ  বাগানের মালিক মোছা. সালমা বেগম বলেন, এই বাগান গড়ে তুলতে গত আট বছরে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা খরচ হয়েছে। নিজের টাকা নয়, বিভিন্ন এনজিও থেকে চড়া সুদে ঋণ নিয়ে এই টাকা বাগানে খাটিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম এবার ফল বিক্রি করে ঋণের টাকা শোধ করব। অথচ বন বিভাগ আমাদের সব শেষ করে দিল। বাগান না কেটে যদি আমাদের ঘরে তালা দিয়ে পুড়িয়ে মারত, তাহলেও এত কষ্ট হতো না। এখন এই ঋণের বোঝা নিয়ে আমরা কোথায় যাব? কীভাবে ঋণ শোধ করব?
দুই হাত মাথায় দিয়ে কান্নাজড়িত কণ্ঠে কথাগুলো বলতে বলতে বারবার ভেঙে পড়ছিলেন তিনি। ১৫-২০ লাখ টাকার বিনিয়োগ, ২৫-২৬ লাখ টাকার ফলনের আশা
সালমা বেগম ও তাঁর স্বামী আলিম উল্লা (পিতা: মৃত মহেব উল্লা) জানান, বনের প্রায় ১০ কিয়ার (কানি) জমিতে দীর্ঘ আট বছর ধরে কমলা, পেঁপে ও লাউয়ের বাগান গড়ে তোলেন তারা। বিভিন্ন এনজিও থেকে নেওয়া প্রায় ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকার ঋণ বিনিয়োগ করা হয় এই বাগানে।
তাদের দাবি, আরও প্রায় তিন মাস পর বাগান থেকে ২৫ থেকে ২৬ লাখ টাকার ফল বিক্রি করে ঋণের বড় একটি অংশ পরিশোধ করার পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু বন বিভাগের অভিযানে সেই স্বপ্ন মুহূর্তেই ধুলিস্যাৎ হয়ে গেছে।
বৃদ্ধা শাশুড়ির অভিযোগ: ‘টাকা দিতে পারিনি বলেই এই শাস্তি’ সালমা বেগমের শাশুড়ি আলেকজান বিবি বলেন, আমরা তো চোর-ডাকাত নই। কষ্ট করে গাছ বড় করেছি। প্রতিবছর বন কর্মকর্তাদের নিয়ম করে মাসোহারা দিয়েছি। কিন্তু এবার তারা বেশি টাকা চাইলে আমরা দিতে পারিনি। টাকা দিতে না পারার কারণেই আমার ছেলের বউয়ের স্বপ্ন এভাবে কেটে শেষ করে দেওয়া হয়েছে। এখন এনজিওর লোকজন কিস্তির জন্য এলে আমরা কী জবাব দেব?”
প্রতিহিংসামূলক অভিযানের অভিযোগ স্থানীয়দের, সরকারি জমি উদ্ধারের নামে এই অভিযান পরিচালিত হলেও এর পেছনে রয়েছে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা। কয়েক দিন আগে বন বিভাগের কথিত লিজ বাণিজ্য ও মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ এনটিভিতে প্রকাশের সময় ভুক্তভোগী পরিবার সাংবাদিকদের কাছে এসব তথ্য তুলে ধরেছিল। সেই ক্ষোভ থেকেই তাদের লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের আরও দাবি, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে বনের জমি বনায়নের নামে টাকার বিনিময়ে অলিখিতভাবে বিভিন্ন ব্যক্তিকে পান ও জুম চাষের জন্য ব্যবহার করতে দিয়েছেন। অথচ সেইসব জায়গায় কোনো অভিযান না চালিয়ে শুধু এই পরিবারের বাগান ধ্বংস করা হয়েছে।
সেচ মেশিনও ভাঙচুরের অভিযোগ  ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, শুধু গাছ কেটেই ক্ষান্ত হয়নি অভিযানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা। তাদের একমাত্র পানি সেচের মেশিনটিও ভেঙে ফেলা হয়েছে, যাতে অবশিষ্ট গাছগুলোও বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব না হয়।
এ ঘটনায় স্থানীয়দের প্রশ্ন, “টাকা দিলে একটি বাগান আট বছর ধরে বৈধ থাকে, আর টাকা না দিলেই রাতারাতি অবৈধ হয়ে যায় কীভাবে?”
ধ্বংসস্তূপে বসে অনিশ্চিত ভবিষ্যৎ সরেজমিনে কালিঞ্জি এলাকার বাগানে গিয়ে দেখা যায়, চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে কাটা কমলা গাছের ডালপালা। ধ্বংস হয়ে যাওয়া বাগানের মাঝখানে নির্বাক বসে ছিলেন সালমা বেগম ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। ঋণের কিস্তি, সংসারের ভবিষ্যৎ এবং জীবিকা নিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে তাদের।
 রাজকান্দি রেঞ্জ সহকারী বন সংরক্ষক রেঞ্জ কর্মকর্তা  প্রীতম বড়ুয়া বলেন, সংরক্ষিত বনের ভেতরে যেকোনো ধরনের জবরদখল তা পান, কমলা কিংবা আনারস চাষ যা-ই হোক না কেন তা সম্পূর্ণভাবে অগ্রহণযোগ্য এবং আইনগতভাবে সম্পূর্ণ বেআইনি। রেঞ্জ কর্মকর্তা জানান, বনের জমি অবমুক্ত করতে বন বিভাগের উচ্ছেদ তৎপরতা সর্বদা চলমান। তিনি বলেন, এটি একটি জবরদখল তা আট বছর হোক আর দশ বছর হোক, যত বছরই হোক না কেন, এটি বেআইনি। বন বিভাগ সবসময় যেকোনো ধরনের জবরদখল উচ্ছেদ করতে বদ্ধপরিকর। রাজকান্দি রেঞ্জের অধীনে যত জবরদখল রয়েছে, আমরা ধীরে ধীরে সেগুলো অবমুক্ত করার চেষ্টা করছি। প্রতি মাসেই আমাদের এ ধরনের একাধিক উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয় ।
টাকা দিলে একটি বাগান আট বছর ধরে বৈধ থাকে, আর টাকা না দিলেই রাতারাতি অবৈধ হয়ে যায় কীভাবে?” এই স্পর্শকাতর প্রশ্নটি সরাসরি এড়িয়ে গেছেন রাজকান্দি রেঞ্জ সহকারী বন সংরক্ষক রেঞ্জ কর্মকর্তা
এ বিষয়ে সিলেট বন বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আব্দুর রহমান জানান বন ভিলেজারদের সুযোগ-সুবিধার বিষয়টি স্পষ্ট করে তিনি বলেন, “১৯২০ সালের দিকে যখন প্রথম ভিলেজার সিস্টেম চালু হয়, তখন একেক পরিবারকে কেবল ভ্যালিতে (নিচু জমিতে) ধান চাষের জন্য জমি দেওয়া হতো। পাহাড় বা টিলার ওপরে ফল বাগান করার কোনো বিধান বা নিয়ম বন আইনে নেই। কখন, কে এটি লাগানোর অনুমতি দিয়েছে তার কোনো ভিত্তি নেই। বনের জমিতে কোনো ফল বাগান থাকবে না, সেখানে বনায়ন করা হবে এই নীতি অনুযায়ীই এটি কেটে পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। বন বিভাগের কোন যদি এসব অনিয়মের সাথে সম্পৃক্ত থাকে, তাহলে তথ্য প্রমান পেলে ব্যবস্হা নেওয়া হবে।


আরো সংবাদ পড়ুন...