• বৃহস্পতিবার, ১৩ অগাস্ট ২০২৬, ০৮:২৮ অপরাহ্ন
  • |
  • |
সংবাদ শিরোনাম :
শ্রীমঙ্গল থেকে হবিগঞ্জ-সিলেট বিরতিহীন বাসে যাত্রী ওঠানামার সুযোগ চান যাত্রীরা ভিউয়ের নেশায় জীবন ঝুঁকিতে: সাপ নিয়ে বিপজ্জনক কনটেন্ট বন্ধ হোক পরিবেশ রক্ষায় কমলগঞ্জে শিক্ষার্থীদের নিয়ে ফলজ গাছের চারা রোপণ ও বিতরণ স্বামীর সম্পত্তি অধিকার চান শ্রীমঙ্গলের রহিমা শ্রীমঙ্গলের অভিজাত লন্ডন রেস্টুরেন্টে দক্ষ ম্যানেজার নিয়োগ সিলেটে বিআরটিসির নতুন টিকিট কাউন্টার উদ্বোধন, ১৮ রুটে বাস সার্ভিস কমলগঞ্জে বন্যাকবলিত ৬৫০ পরিবারের পাশে সিএনআরএস, নগদ সহায়তা ও হাইজিন কিট বিতরণ ৯৯৯-এ কলের পর হামহাম জলপ্রপাতে আটকে পড়া ১০ পর্যটককে উদ্ধার করল পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস ৮ বছর ধরে চাঁদা দেওয়ার পর এক কিস্তি বন্ধ, ফল ধরার আগমুহূর্তে ১,২০০ কমলা গাছ কাটার অভিযোগ বন বিভাগের বিরুদ্ধে শ্রীমঙ্গলে মাদকবিরোধী সচেতনতা মূলক সভা অনুষ্ঠিত

ভিউয়ের নেশায় জীবন ঝুঁকিতে: সাপ নিয়ে বিপজ্জনক কনটেন্ট বন্ধ হোক

রিপোটার : / ১৩৭ বার দেখা হয়েছে
প্রকাশিত : মঙ্গলবার, ১১ আগস্ট, ২০২৬

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এখন তথ্য, বিনোদন ও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। কিন্তু জনপ্রিয়তা পাওয়ার প্রতিযোগিতায় কখনো কখনো এমন কিছু কনটেন্ট সামনে আসে, যা বিনোদনের চেয়ে ঝুঁকি তৈরি করে বেশি।
সাপ নিয়ে তৈরি ঝুঁকিপূর্ণ ভিডিও তারই একটি উদাহরণ।
ফেসবুক, ইউটিউব কিংবা অন্যান্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায়ই দেখা যায়,কেউ বিষধর সাপ হাতে নিয়ে ভিডিও করছেন, কেউ সাপের সামনে বসে নানা অঙ্গভঙ্গি করছেন, আবার কেউ বন কিংবা পাহাড়ে গিয়ে সাপ ধরে ক্যামেরার সামনে কসরত করছেন।
দর্শকের কাছে এসব দৃশ্য হয়তো রোমাঞ্চকর। কিন্তু বাস্তবতা হলো সাপ কোনো খেলনা নয়।
একটি ভুল মুহূর্ত, একটি ভুল সিদ্ধান্ত কিংবা সাপের আচরণ সম্পর্কে সামান্য ভুল ধারণাই বড় ধরনের দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
অজ্ঞতা যখন সাহসিকতার নাম নেয়
সাপ নিয়ে কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ভিডিও নির্মাতার সাপটির প্রজাতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান নেই। কখনো একটি সাপকে অন্য প্রজাতির নামে পরিচয় করানো হচ্ছে, আবার কখনো স্থানীয় কোনো নামকে বৈজ্ঞানিক পরিচয় হিসেবে উপস্থাপন করা হচ্ছে।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো,সাপটির পরিচয় নিশ্চিত না হয়েও সেটিকে হাতে তুলে নেওয়া হচ্ছে।
এখানে একটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসে,যে ব্যক্তি সাপটির প্রজাতিই নিশ্চিতভাবে জানেন না, তিনি কীভাবে বুঝবেন সাপটির আচরণ ও ঝুঁকি কতটা?
সাপ সম্পর্কে জ্ঞান থাকা আর সাপের সঙ্গে ঝুঁকিপূর্ণ আচরণ করা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। প্রকৃত সাপবিশেষজ্ঞরাও অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি এড়িয়ে চলেন।
সাপুড়ের সাপ মানেই নিরাপদ নয়
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অনেক ভিডিওতে দেখা যায়, সাপুড়ের কাছ থেকে সাপ সংগ্রহ করে তা দিয়ে কনটেন্ট তৈরি করা হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আরও একটি বিপজ্জনক ধারণা সাপটি যেহেতু মানুষের কাছে থাকে, কিংবা তার বিষদাঁত ভেঙে ফেলা হয়েছে, তাই সেটি নিরাপদ।
এ ধারণা ভুল এবং অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
বন্যপ্রাণী মানুষের সংস্পর্শে অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও তার স্বাভাবিক প্রতিরক্ষামূলক আচরণ পুরোপুরি হারিয়ে যায় না। ভয়, চাপ, উত্ত্যক্ত করা কিংবা হঠাৎ কোনো উদ্দীপনায় সাপ আত্মরক্ষার চেষ্টা করতে পারে।
একইভাবে বিষধর সাপের বিষদাঁত নিয়ে প্রচলিত লোককথা বা অনুমানের ওপর নির্ভর করাও বিপজ্জনক। বিষদাঁত ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সাপটিকে নিরাপদ ধরে নেওয়ার কোনো কারণ নেই। তাই ‘বিষদাঁত নেই’ বা ‘বিষদাঁত ভেঙে দেওয়া হয়েছে’এমন দাবির ভিত্তিতে কোনো বিষধর সাপকে হাতে নেওয়া কখনোই নিরাপদ আচরণ নয়।
সাপকে নিরাপদ মনে করার সবচেয়ে বড় কারণ হতে পারে মানুষের অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাস। আর সেই আত্মবিশ্বাসই কখনো কখনো দুর্ঘটনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
পদ্মগোখরো, খৈয়াগোখরো নাকি কিং কোবরা?
সাপ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আরেকটি বড় সমস্যা হলো ভুল শনাক্তকরণ।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সাপের স্থানীয় নামের বৈচিত্র্য রয়েছে। একই সাপকে একেক এলাকায় একেক নামে ডাকা হতে পারে। আবার একই স্থানীয় নাম দিয়ে ভিন্ন সাপকেও বোঝানো হতে পারে।
ফলে শুধু স্থানীয় নামের ওপর নির্ভর করে সাপ শনাক্ত করা ঠিক নয়।
বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কখনো পদ্মগোখরো বা অন্য কোনো গোখরো প্রজাতির সাপকে ‘কিং কোবরা’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ পদ্মগোখরো, খৈয়াগোখরো এবং কিং কোবরা,একই প্রজাতির সাপ নয়।
ভুল শনাক্তকরণ কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তার উদাহরণও আমরা বিভিন্ন সময়ে সংবাদমাধ্যমে দেখেছি। সাপের প্রজাতি না চিনে শুধু অনুমানের ভিত্তিতে সেটিকে ধরতে গিয়ে মানুষের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
এ ধরনের ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়—সাপকে না চিনে সাপ ধরার চেষ্টা কখনোই করা উচিত নয়।
সাপ শনাক্তকরণ একটি বিশেষায়িত বিষয়। শারীরিক বৈশিষ্ট্য, বিস্তৃতি, আচরণসহ বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক বৈশিষ্ট্য বিবেচনা করেই প্রজাতি নির্ধারণ করতে হয়।
তাই ক্যামেরার সামনে দাঁড়িয়ে অনুমানের ভিত্তিতে সাপের পরিচয় ঘোষণা না করে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়াই দায়িত্বশীল আচরণ।
বিষধর সাপের কামড় কোনো মজা নয়
কিছু বিষধর সাপের বিষে নিউরোটক্সিক প্রভাব থাকতে পারে। এ ধরনের বিষ স্নায়ুতন্ত্রে প্রভাব ফেলতে পারে এবং গুরুতর ক্ষেত্রে শ্বাস-প্রশ্বাসের কার্যক্রমও ব্যাহত হতে পারে।
তাই বিষধর সাপের কামড়কে কখনোই ‘দেখি কী হয়’ ধরনের বিষয় হিসেবে নেওয়া উচিত নয়।
সাপে কাটার পর নির্দিষ্ট কয়েক মিনিটের হিসাব ধরে অ্যান্টিভেনম নেওয়ার ধারণাটিও সঠিক নয়। অ্যান্টিভেনম প্রয়োজন হবে কি না, তা নির্ভর করে সাপের প্রজাতি, বিষক্রিয়ার লক্ষণ এবং রোগীর শারীরিক অবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয়ের ওপর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো,সাপে কাটলে সময় নষ্ট না করে দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে পৌঁছানো।
অ্যান্টিভেনম প্রয়োজন হলে চিকিৎসকেরা রোগীর অবস্থা মূল্যায়ন করে যথাযথ চিকিৎসা দেবেন।
ওঝা নয়, দ্রুত চিকিৎসা
সাপের কামড়ের পরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় মানুষ ওঝা, কবিরাজ, ঝাড়ফুঁক কিংবা নানা লোকজ পদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন। এতে সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস,সময়,নষ্ট হতে পারে।
সাপে কাটলে আক্রান্ত ব্যক্তিকে শান্ত রাখা, অযথা হাঁটাচলা না করানো এবং দ্রুত উপযুক্ত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়া জরুরি।
সাপটিকে ধরতে, মারতে কিংবা চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা উচিত নয়। নিরাপদ দূরত্ব থেকে ছবি পাওয়া গেলে তা শনাক্তকরণে সহায়তা করতে পারে। তবে একটি ছবি তোলার জন্যও নিজের জীবনকে ঝুঁকিতে ফেলা যাবে না।
বন্যপ্রাণীকে সম্মান করতে হবে
সাপ নিয়ে ভিডিও তৈরির ক্ষেত্রে শুধু মানুষের নিরাপত্তাই নয়, বন্যপ্রাণীর কল্যাণের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
বন্যপ্রাণীকে ধরে এনে বারবার ক্যামেরার সামনে প্রদর্শন করা, উত্ত্যক্ত করা কিংবা তার স্বাভাবিক আচরণে হস্তক্ষেপ করা প্রাণীটির জন্যও চাপ ও ক্ষতির কারণ হতে পারে।
প্রকৃতিকে ভালোবাসার অর্থ বন্যপ্রাণীকে হাতে তুলে নেওয়া নয়। বরং তার স্বাভাবিক পরিবেশে তাকে নিরাপদে থাকতে দেওয়াই প্রকৃতির প্রতি সম্মান।
আমাদের কী করা উচিত?
সাপ দেখলে আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই। আবার অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসী হওয়ারও সুযোগ নেই।
আমাদের সবার কিছু বিষয় মনে রাখা জরুরি
১. বিষধর কিংবা নির্বিষ,যে কোনো সাপ দেখলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে।
২. সাপকে উত্ত্যক্ত করা, ধরার চেষ্টা করা কিংবা ভিডিও করার জন্য কাছে যাওয়া যাবে না।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার জন্য সাপ নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্ট তৈরি থেকে বিরত থাকতে হবে।
৪. সাপে কাটলে ওঝা, কবিরাজ বা ঝাড়ফুঁকের পেছনে সময় নষ্ট না করে দ্রুত হাসপাতালে যেতে হবে।
৫. সাপ শনাক্তকরণে অনুমানের পরিবর্তে বিশেষজ্ঞ বা নির্ভরযোগ্য উৎসের সাহায্য নিতে হবে।
৬. সাপের ছবি তুলতে হলে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ছবি তোলার জন্য কখনোই সাপের কাছে যাওয়া যাবে না।
কয়েকটি লাইক কি একটি জীবনের চেয়ে বেশি মূল্যবান?
একটি ভিডিও ভাইরাল হতে পারে। কয়েক হাজার মানুষ সেটি দেখতে পারে। লাখ লাখ ভিউও আসতে পারে।
কিন্তু একটি মানুষের জীবন ফিরে পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনপ্রিয় হওয়ার প্রতিযোগিতায় আমরা যেন ভুলে না যাই,ক্যামেরার সামনে কয়েক মিনিটের রোমাঞ্চ বাস্তব জীবনে দীর্ঘস্থায়ী বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
সাপ নিয়ে খেলা সাহসিকতা নয়। সাপকে চিনুন, তার আচরণ সম্পর্কে জানুন এবং তাকে তার স্বাভাবিক পরিবেশে থাকতে দিন।
সাপকে ভয় নয়,সাপ সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান প্রয়োজন।
কয়েকটি লাইক, কিছু ভিউ কিংবা সাময়িক জনপ্রিয়তার জন্য নিজের জীবনকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলা কোনোভাবেই বুদ্ধিমানের কাজ নয়।
আজ যে ঝুঁকিপূর্ণ ভিডিও দেখে আমরা হাততালি দিচ্ছি, কাল সেই একই ঝুঁকি কারও জীবনে অপূরণীয় ক্ষতি ডেকে আনতে পারে।
তাই সময় এসেছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি নতুন বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার
“সাপ নিয়ে খেলাধুলা নয়, সাপ সম্পর্কে সচেতনতা চাই।”
সচেতন হোন। নিরাপদ থাকুন। বন্যপ্রাণীকে তার নিজস্ব পরিবেশে বাঁচতে দিন।

 

লেখক : মো. শামসুর রাজা চৌধুরী

সাংবাদিক ও পরিবেশকর্মী


আরো সংবাদ পড়ুন...